জানুয়ারি 28, 2026

ভোলার উপকূলে অস্তিত্ব সংকটে অতিথি পাখি

জানুয়ারি 20, 2026

ডেস্ক নিউজ

শীতের চিরচেনা রূপ পাল্টে যাচ্ছে ভোলার উপকূলীয় চরাঞ্চলে। এক সময় দিগন্তজোড়া জলরাশিতে হাজার হাজার অতিথি পাখির জলকেলি আর কিচিরমিচির শব্দে মুখর থাকত যে চরগুলো, সেখানে এখন যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ আর মানুষের কোলাহল।

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা ভোলার উপকূলীয় বিচরণভূমিগুলো এখন পরিযায়ী পাখিদের জন্য হয়ে উঠেছে চরম অনিরাপদ। মানুষের সৃষ্ট এসব বহুমুখী সমস্যার কারণে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনক হারে কমছে এবং পাখিরা প্রতিনিয়ত পরিবর্তন করছে তাদের আবাসস্থল। এতে একদিকে যেমন শীতকালীন উপকূলীয় পরিবেশ তার সহজাত সৌন্দর্য হারাচ্ছে, অন্যদিকে প্রকৃতির ভারসাম্য হারাচ্ছে।

ভোলার চর কুকরী মুকরী, ঢালচর ও মনপুরাসহ উপকূলের বিভিন্ন ডুবোচরগুলোতে হাজার হাজার অতিথি পাখির ডানা মেলে উড়ে চলা, দলবেঁধে খাবার সংগ্রহের প্রতিযোগিতা আর জলকেলি ছিল শীত মৌসুমের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু বর্তমানে সেসব চরের দৃশ্যপটে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে।


স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্য অনুযায়ী, চর কুকরী মুকরী, চর শাহজালাল, চর শাজাহান, চর পিয়াল, আইলউদ্দিন চর, চরনিজাম, দমার চর, ডেগরারচরসহ মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী প্রায় অর্ধশত নতুন চর একসময় পাখিদের 
নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র ছিল। তীব্র শীত থেকে বাঁচতে এবং খাবারের সন্ধানে সুদূর সাইবেরিয়া বা হিমালয় অঞ্চল থেকে আসা এসব অতিথিদের কলতানে মুখর থাকত সাগরকূলের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। তবে মানুষের বসতি স্থাপন, কৃষি আবাদ বৃদ্ধি, পর্যটকদের অনিয়ন্ত্রিত ঘোরাঘুরি এবং চরাঞ্চলগুলোকে গোচারণভূমি হিসেবে ব্যবহারের ফলে সেই মুখর পরিবেশ এখন স্তব্ধপ্রায়।
চর কুকরী মুকরির নারিকেল বাগানের বাসিন্দা নিয়ামুল মাঝি ও তাড়ুয়ার ব্যবসায়ী মিজান খানসহ স্থানীয়রা জানান, দিনরাত যান্ত্রিক নৌযানের শব্দদূষণ এবং মানুষের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে পাখিরা এখন আর আগের মতো এসব চরে ভিড়ছে না।

সম্প্রতি বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের রিসার্চ কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান ড. সায়াম ইউ. চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ১১ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা আট দিন উপকূলীয় এলাকায় পাখি শুমারি পরিচালনা করেছেন। এই দলটির সদস্যরা ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী ও পটুয়াখালীর প্রায় ৫৩টি চরে পাখি গণনার কাজ করেন।

ড. সায়ামের দেওয়া তথ্য অনুসারে, এবারের জরিপে উপকূলীয় মেঘনা মোহনার ৫৩টি স্থানে ৬৩ প্রজাতির মোট ৪৭ হাজার ১৫৭টি জলপাখির অস্তিত্ব রেকর্ড করা হয়েছে। এবারের শুমারিতে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইউরেশিয়ান উইজিয়ন প্রজাতির পাখি, যার সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১২টি। এছাড়া ব্ল্যাক-টেইলড গডউইট ৪ হাজার ৪৩৪টি এবং লেসার স্যান্ড প্লোভার ৩ হাজার ৯৬২টি শনাক্ত করা হয়েছে।

এই জরিপে আরও দেখা গেছে, ভোলার মনপুরার কাছে চর আতাউর, ভাসান চরের কাছে জৈজ্জার চর এবং আন্ডার চরে জলপাখির সর্বাধিক ঘনত্ব বজায় ছিল। এর মধ্যে চর আতাউরে ৬ হাজার ৪৭৯টি, জৈজ্জার চরে ৫ হাজার ৮১৪টি এবং আন্ডার চরে ৪ হাজার ৯৮৭টি পাখি রেকর্ড করা হয়েছে। শুমারি দলটি বর্তমানে ঢাকায় ফিরে সংগৃহীত তথ্য যাচাই-বাছাই করছে এবং শীঘ্রই পাখি কমে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।

পাখি শুমারি দলের সদস্য ও বিশিষ্ট পর্বতারোহী এম এ মুহিত উপকূলের পরিবর্তিত পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, এক সময় ভোলার উপকূলীয় অঞ্চলে বার-হেডেড গুজ বা রাজহাঁস জাতীয় পাখি হাজারেরও বেশি দেখা যেত, অথচ এ বছর সেই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫টিতে। একইভাবে খয়রা চখাচখি ও গাঙচষা পাখির সংখ্যাও আগে হাজারের ঘরে থাকলেও এখন তা মাত্র শতকের ঘরে ঠেকেছে। সংখ্যায় কমে যাওয়া পাখিদের তালিকার মধ্যে আরও রয়েছে উত্তরে খুন্তেহাঁস, লেনজা হাঁস, ইউরেশিয়ান টিল, গ্যাডওয়াল ও বিভিন্ন প্রজাতির সৈকত পাখি। এমনকি হাড়গিলা নামের পরিযায়ী পাখি যা আগে শত শত দেখা যেত, এ বছর শুমারি চলাকালে সেটির একটিরও দেখা মেলেনি। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, উপকূলীয় বাস্তুসংস্থান পাখিদের বসবাসের উপযোগীতা হারাচ্ছে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, স্কোপ ফাউন্ডেশন এবং বার্ডলাইফ ইন্টারন্যাশনালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই শুমারিতে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান শুমারি দলের সদস্য নাজিম উদ্দিন প্রিন্স। তিনি বলেন, ভোলার পার্শ্ববর্তী চরগুলোতে পাখির সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ার পেছনে পাখি শিকারিদের উপদ্রব যেমন দায়ী, তেমনি নতুন আপদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে তরমুজ চাষ। এই কৃষিকাজের ফলে পাখিদের বিচরণভূমি সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
শুমারি দলের আরেক সদস্য মো. ফয়সাল জানান, তাদের এই কার্যক্রম মূলত জলচর ও পরিযায়ী পাখি কেন্দ্রিক ছিল এবং প্রতিবছরই তারা আবাসস্থল নষ্ট হওয়া ও পাখি শিকারের মতো নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছেন।

শুমারি দলের সঙ্গে পুরো সময় চরের অভয়াশ্রমগুলো পর্যবেক্ষণ করেছেন বন অধিদফতরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা ফা-তু-জো খালেক মিলা। তিনি বলেন, পরিযায়ী পাখিদের আশ্রয়ের জন্য জোয়ার-ভাটায় প্লাবিত কাদাজলের চরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এসব এলাকায় মানুষের আনাগোনা ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় পাখিরা ভীত হয়ে এলাকা ছাড়ছে। প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অতি গুরুত্বপূর্ণ এই চরগুলোতে মানুষের অবাধ যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ ও সীমাবদ্ধ করার জন্য বন অধিদফতরের পক্ষ থেকে শীঘ্রই কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

আরো দেখুন