বিডি ডেস্ক নিউজ
পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার মিয়াবাড়ি মসজিদটি মোগল আমলের স্থাপত্যের এক দৃষ্টিনন্দন নিদর্শন, যা প্রায় ৪০০ বছরের পুরোনো। ভান্ডারিয়া পৌর শহরের মিয়াবাড়ির কাছে পোনা নদীর তীরে অবস্থিত এই মসজিদ। এক গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি এর সূক্ষ্ম নকশার জন্য বিখ্যাত। বর্তমানে এটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে সুরক্ষিত। ছোট এই মসজিদটিতে মোগল আমলের স্থাপত্যশৈলীর পাশাপাশি এর নকশায় স্থানীয় কারুকার্যের প্রভাবও দেখা যায়। এটি প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ও ১৭ ফুট চওড়া। এই মসজিদটি শুধু একটি ধর্মীয় স্থানই নয়, বরং এলাকার ইতিহাস ও স্থাপত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, যা পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয়।
বেশ কিছুদিন ধরে এই স্থাপনাটির সংস্কার দাবি করে আসছিলেন স্থানীয়রা। অবশেষে ২০২২ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মিয়াবাড়ি মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। লাল ইট ও চুনাপাথরের মিশ্রণে তৈরি করা হয়েছে মসজিদের দেওয়াল। স্থানীয়দের মতে, এটি নির্মাণের সময় গম্বুজের ছাদ ও খিলানের কারুকার্যে সোনার প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। যদিও বর্তমানে এর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। দেওয়ালের লাল ইটের বিন্যাস ও পোড়ামাটির ফলকের শিল্পকর্ম সবাইকে আকৃষ্ট করে। প্রতিবছর প্রচুর পর্যটক মসজিদটি দেখার জন্য এখানে ছুটে আসেন।
আবুল কালাম আজাদ নামের স্থানীয় এক মুসল্লি জানান, কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে মসজিদটি সংস্কার করে। এই মসজিদটি ছাড়াও এ উপজেলায় স্থানীয় কাজী বাড়ি মসজিদ, ভান্ডারিয়া থানার পেছনের মসজিদ ও ভেলাই চোপদারের বাড়ির মসজিদসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের আরও ৬টি মসজিদ রয়েছে। যা এখনো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদগুলো।
স্থানীয়রা জানান, মসজিদগুলোর দেওয়ালে লাল ইট আর চুনাপাথরের মিশ্রণের কাজে দিল্লির লাল ইটের স্থাপত্যরীতির প্রভাব রয়েছে। এর দেওয়ালগুলোতে রয়েছে ইটের বিন্যাস, পোড়ামাটির ফলকের কাজ। ছাদের গম্বুজ ও খিলানে এক সময় ছিল সোনালি প্রলেপের কাজ। তবে বর্তমানে তা আর দৃশ্যমান নয়। রেলিং ও প্রাচীরে ঘেরা ছোট্ট সুন্দর এই মসজিদগুলোতে মিহরাব এবং এক গম্বুজের ভেতরের অংশ পাথরের ফুল, চমৎকার লতাপাতা ও আরব্য নকশায় খোদাইকৃত। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে রয়েছে পোড়ামাটির নকশার কাজ, যা মোগল ও স্থানীয় শিল্পরীতির নিপুণ সমন্বয়। ভেতরের চমৎকার ফুলেল নকশায় নির্মিত মসজিদটি নামাজের কাজ ছাড়াও বিচারকার্য এবং সভা পরিচালনার কাজেও ব্যবহৃত হতো।
স্থানীয়রা আরও জানান, মিয়াবাড়ির মসজিদে এক কাতারে একসঙ্গে অন্তত ৬ জন মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। বর্তমানে এ মসজিদের ভেতরের অংশ জরাজীর্ণ থাকায় এখন আর কেউ নামাজ পড়তে আসেন না।
মিয়াবাড়ির বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন কাজল জানান, পূর্ব ভান্ডারিয়া গ্রামে একটি প্রাচীন দিঘি রয়েছে। ভেলাই চোকদার নামের একজন ধনাঢ্য জমিদার প্রায় পাঁচ একর জমির ওপর মোগল আমলে এ দিঘিটি খনন করেন। এ দিঘির পাড়ে ভেলাই চোকদার নির্মিত একটি মসজিদসহ দুটি দালান প্রাচীনকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যদিও এ মসজিদগুলোর নির্মাণকাল বা নির্মাতার নিশ্চিত পরিচয় জানা যায়নি, তারপরও স্থাপত্য তথ্য বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়, মোগল আমলের শেষদিকে সম্ভবত এই স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছিল।
মিয়াবাড়ির মসজিদের চারপাশ ঘিরে রয়েছে ফুলবাগান ও এর সামনে রয়েছে একটি বড় পুকুর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মিয়াবাড়ি মসজিদটি সংস্কার করে এটাকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি মসজিদ হিসাবে ঘোষণা করে।
এ/আর-23/01/2026